কবি-অনুবাদক মবিনুল হক
মবিনুল হক
জন্ম:-১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে পুরুলিয়া জেলার পুঞ্চা গ্রামে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক। বিশ শতকের সত্তরের দশকে কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু। সেসময়ে (১৯৭৭-৮৭) সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যপত্র 'পিরামিড'। অনুবাদ ছাড়া সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখেছেন। পশ্চিমবঙ্গের সমকালীন বাংলা সাহিত্যে উর্দু ও হিন্দি ভাষা থেকে অনুবাদের ক্ষেত্রে তাঁর তরজমা বিশিষ্টতা সূচক। কেননা তাঁর পারিবারিক ভাষা উর্দু আর শিক্ষাদীক্ষা ও সাহিত্যচর্চার ভাষা বাংলা। অনুবাদে মূল ভাষার সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক।মুল আর অনূদিত ভাষার প্রতি ঘনিষ্ঠতা, বেড়ে ওঠা প্রেম তাঁর অনুবাদকে করে তুলেছে সৃজনশীলতায় ভাস্বর।
মবিনুল হক ২০১৮ সালে 'ইসমত চুঘতাই-এর "লেপ ও অন্যান্য গল্প" অনুবাদ গ্রন্থের জন্য 'সাহিত্য অকাদেমি' পুরস্কার সম্মানিত হয়েছেন।
উর্দু কবি কিশ্ ওয়র নাহীদ-এর কবিতা
অনুবাদে কবি-অনুবাদক মবিনুল হক
অবিভক্ত ভারতের বুলন্দশহরে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে কিশ্ ওয়র নাহীদ জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পরিবার পাকিস্তানের লাহোরে চলে যান। প্রথাগত পড়াশোনায় না গিয়ে তিনি করেস্পন্ন্ডেন্স কোর্সের মাধ্যমে বাড়ি থেকেই হাইস্কুলস্তরের ডিপ্লোমা অর্জন করেন। পরবর্তীকালে লাহোরের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে বি.এ পাস করেন এবং ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ইকোনমিক্স এম.এ পাস করেন। বন্ধু কবি ইউসুফ কারনান-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কবি ও লেখক হিসেবে তিনি পাকিস্তানে নবীন-প্রবীণ সকলের কাছেই 'কিশ ওয়ার আপা' সম্বোধনে অবহিত হন।
পাকিস্তানের নারীবাদী লেখিকাদের মধ্যে অগ্রগণ্যা কিশ্ ওয়ার নাহীদ-র কাব্যকৃতি ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এ পর্যন্ত তাঁর আটটি কাব্যগ্রন্থ, একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ও কয়েকটি নারীবাদী চেতনাকেন্দ্রিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে 'আওরাত ইক নাফসিয়াতি মুতালা' শিরোনামে সিমোন দি ব্যেভোহার 'দ্য সেকেন্ড সেক্স' গ্রন্থের উর্দু অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ' লব-ই গোয়া'-র জন্য 'আদমজি' পুরস্কারে সম্মানিত হন। শিশুসাহিত্যে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য 'ইউনেস্কো' পুরস্কার এবং সাহিত্য সামগ্রিক অবদানের জন্য পাকিস্তানের 'সিতারা-ই ইমতিয়াজ' পুরস্কারে সম্মানিত হন। তাঁর উর্দু কবিতার অনুবাদ ইংরেজি সহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখি ছাড়াও তিনি একসময় পাকিস্তানের বিখ্যাত উর্দু সাহিত্যপত্র 'মাহে নও' সম্পাদনা করেছেন। তিনি নিজে হাওয়া (ঈভ) নামে একটি সংগঠন দুঃস্থ অভাবী মহিলাদের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গড়ে তোলেন-- যেখানে কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের বিপণনের দ্বারা মহিলারা স্বনির্ভর হতে পারেন। (এখানে অনূদিত কবিতা দু'টির মুল উর্দুপাঠ দিল্লি থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত উর্দু সাহিত্যপত্র 'জেহন- এ- জদীদ'-এর সেপ্টেম্বর'০৫-- ফেব্রুয়ারি '০৬ সংখ্যা থেকে নেওয়া হয়েছে--অনুবাদক)।
ক্রমহ্রাসমান ক্রমবর্ধমান ছায়া
আমাকে আরও একবার মুসলমান বানানো হল
আমি জীবনের সমস্ত রঙ
সমস্ত সকাল, সমস্ত সন্ধ্যা
এভাবেই আযান শুনে সময় আন্দাজ
করে আসছিলাম,যেভাবে বিগত যুগের লোকজন ক্রমবর্ধমান আর ক্রমহ্রাসমান ছায়া দেখে
সময় আন্দাজ করত
আমার ত্রিশ বছর বয়স হল
এর আগেও আমাকে একবার মুসলমান বানানো হয়েছিল
সে সময় টেলিভিশনে ওজু- করা শেখানো হতো
নামাজ পড়ার পদ্ধতি শেখানো হতো
আর আমার সন্তানেরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করত--
আম্মা! এরা কাদের মুসলমান বানাচ্ছে?
তারা কি সেই সব হাজী,যারা ব্যবসা করে ভেজালের
আর প্রতিবছর উমরা করে
অথবা সেই সব স্মাগলাগদের
যারা দাতা সাহেবের দরগায় হাজার হাজার টাকার চেক
ছোট দান বাক্সে ফেলে যায়
আমার নাতনি খাবার খাওয়ার আগে
ইংরেজিতে 'বিসমিল্লাহ' পড়ে
কিন্তু সে মুসলমান নয়
আমার জাপানি বন্ধু
প্রতিবছর গরিব মেয়েদের শিক্ষা ও লালন- পালনের জন্য
টাকা পাঠিয়ে থাকে
কিন্তু সে মুসলমান নয়
তাহলে ওরা কাফের নিশ্চয়!
কাফের কাদের বলা হয়?
আমরা হযরত ঈশা-কে আমাদের পয়গম্বর মান্য করি
আর হযরত ইব্রাহিম-এর বানানো ঘরের দিকে
মুখ করে নামাজ পড়ি
আর আমরা ঐসব পয়গম্বরদের অনুগামীদের
কাফের বলে থাকি!
আমার মনে আছে, দশ বছর হলো
আমাকে মুসলমান বানানো হয়েছিল
তখন টেলিভিশনে সমস্ত মেয়েদের
দোপাট্টা পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল
তা সে স্বপ্ন দেখতে থাকা নারী হউক বা
পুকুরে ডুবতে থাকা নারী
প্রত্যেকের মাথায় দোপাট্টা ছিল
বহু বছর কেটে গেছে, আমার মা
আর আজকের গ্রামিক মা মেয়েদের
মাথায় দোপাট্টা রয়েছে
কিন্তু তারা ঢোলক বাজিয়ে গান করে
আর ঘরের আঙিনায় বসে হুঁকো টানে
আমাকে আরও একবার মুসলমান বানিয়েছে যারা
তারা ওদের ঢাকাঢুকো মাথাগুলি নগ্ন করতে
আবারও পৌঁছে যাবে এই জন্য
যে ওরা ঢোলক বাজাচ্ছে!
আমাকে আরও একবার মুসলমান বানিয়েছে যারা
তাদের জানা নেই--আমার অন্তরের মানুষকে
আমার সন্তানদের অন্তরের মানুষকে
ওরা এভাবেই বিতর্কিত করে তুলেছে
যাতে আমাদের অন্তরের মানুষকে
কোনো মন্দির অথবা মসজিদ লালন-পালন না করে
আর এটাতো আমার পারিবারিক সংস্কৃতি
যে বয়স্ক বুজুর্গদেরও খোদার হুকুম পালনের জন্য কোনও প্রেরণা প্রস্তুত করার প্রয়োজন হয়না!
আমার নাতনির ঠিক এরকমই হয়েছে
আমি ওকে মানুষ হয়েই থাকতে দেবো
ওকে উত্তরাধিকারের মুসলমান বানাবো না ।
আত্মঘাতী হামলাবাজ তরুণ
তুমি যখন ঘর থেকে বেরিয়েছিলে
আমার মনে নেই তুমি পরোটা খেয়েছিলে নাকি ওমলেট
নাকি কিছুই খাওনি একেবারে
মনে নেই তুমি সবুজ রঙের জামা পরেছিলে
নাকি ধূসর রঙের শালোয়ার
আর এটাও মনে নেই যে তুমি যখন ঘর থেকে বেরিয়েছিলে
তখন কি বাড়ির সকলকে 'খোদাহাফিজ' বলেছিলে
নাকি চুপচাপ বেরিয়ে গিয়েছিলে
নাকি হাসতে হাসতে লাফাতে লাফাতে বেরিয়েছিলে
আমার একথাও মনে নেই যে যখন তুমি ঘর থেকে বেরিয়েছিলে
তখন তোমার হাতে কি রুমাল ছিল
অজানা আর অবিরল অশ্রুমোচনের জন্য
নাকি বারুদ ভরা থলি ছিল
অথবা মৃত্যু এসে তোমার বুকে গান হয়ে
হ্যান্ডগ্রেনেড বেঁধে দিয়েছিল?
যখন তুমি ঘর থেকে বেরিয়ে ছিলে তখন পোশাক বদলে
মৃত্যুও তোমাকে এগিয়ে যেতে বাধা দেয়নি
জীবন তোমার শ্বাস-প্রশ্বাস হয়ে
তোমার সঙ্গে কথা বলতেও দাঁড়িয়ে পড়েনি
তুমি যখন ঘর থেকে বেরিয়েছিলে
সে সময় দোয়া দানকারী
মায়ের হাত কোথাও কি হারিয়ে গিয়েছিল?
কুশল কামনার বাটিতে জল নিয়ে
তোমার বিবি কিংবা বোন দুঢোঁক জল পান করতে
কি বলেনি!
কথা বলো, ঠিকঠাক বলোতো দেখি--
তুমি সেই বিদায় মুহূর্ত কেমন ভাবে কাটিয়েছো? কেননা আমার সামনে কোন নিদর্শন নেই
একথা বিশ্বাস করার জন্য
সেই মুহূর্তে তুমি কেমন ছিলে !
*****
ইসলামী শব্দের ব্যাখ্যা:--
উমরা:-- মক্কার কাবাশরিফে তীর্থদর্শন। একে হজ বলা যায় না। উমরা বছরের যে কোন সময় করা যায়, কেবলমাত্র জিলহজ্ব মাসের ৮,৯,১০ তারিখ ছাড়া। ওই তারিখগুলিতে হজ সম্পন্ন হয়। উমরাতেও হজের মত একই ধর্মাচার পালন করতে হয়, কিন্তু কুরবানি দেওয়া চলে না।
ঈশা:-- ঈশা হলেন যিশুখ্রীষ্ট।
ইব্রাহিম:-- ইহুদি,খ্রিস্টান ও মুসলমানদের আদি পিতা আব্রাহাম
ইব্রাহিমের বানানো ঘর:-- ইসলামি পুরাণ মতে মক্কার কাবাশরিফের আদি প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইব্রাহিম; মুসলমানগন কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়েন।)
Comments
Post a Comment