কবি-প্রাবন্ধিক তাজিমুর রহমান


তাজিমুর রহমান

জন্ম:--২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭০ -এ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার ডায়মন্ড হারবার।বাল্যকাল কেটেছে ‘বাংলা’ নামে গ্রামে।দশক হিসেবে নব্বইয়ের কবি । পেশা-শিক্ষকতা।প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:-আর এক শূন্যের ভিতর(কবিতা পাক্ষিক,২০০২),দহনের বর্ণমালা (সূচীপত্র,২০০৯ ), মাধুকরী তুমি কোন পথে (পত্রলেখা,২০১২), দ্বিতীয়ার চাঁদ ও স্বস্তিক চিহ্ন (সিগনেট প্রেস, আনন্দ পাবলিশার্স২০১৭), শিরোনামহীন একা (দি সী বুক এজেন্সী২০১৮), মৃদুস্বরে যেটুকু বলা যায় (বই টার্মিনাস) প্রকাশিতব্য।পুরস্কার- সুহাসিনী রায় স্মৃতি সম্মাননা', বাংলাদেশ থেকে কবি সাযযাদ কাদির সম্মাননা২০১৯ প্রভৃতি

©/কবির সঙ্গে, কবিতার সঙ্গে








'মহাকবিতা'র সৃজনক্ষেতে একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়


তাজিমুর রহমান


কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়দশক বিচারে ষাটের অন্যতম প্রধান কবি। বাংলা কবিতার প্রেক্ষিতে তাঁকে পাঠক কতকাল মনে রাখবে তা সময় বলবে।কারণ,যে কোন শিল্পের শ্রেষ্ঠ বিচারক যে সময় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।তবে, আমার বিশ্বাস পবিত্রদা(কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়) কালের বিচারে অবশ্যই পাঠকহৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকার দাবিদার তাঁর 'মহাকবিতা'র জন্য।মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'মহাকাব্য' রচনা যদি বাংলা কাব্যের ইতিহাসে অন্যতম মাইলস্টোন হয়ে থাকে, তবে কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের 'মহাকবিতা' সৃষ্টি অবশ্যই মাইলস্টোন।সেই নিরিখে দেখলে তিনি মহাকবিতার জনকও বটে। তাঁর নিজের কথায়,' 'একের পর এক নতুন আঙ্গিকে মহাকবিতা রচনা করেছি।এই সব রচনার(শবযাত্রা,ভাসান, ইবলিশের আত্মদর্শন প্রভৃতি) আঙ্গিক সম্পূর্ণ নতুন। বাংলা ভাষায় কখনো সৃষ্টি হয়নি।'('নৌবত' ব্লগজিন পত্রিকার সাক্ষাৎকার)।অধ্যাপক-কবি সুব্রত রায়চৌধুরীও প্রায় একই মত ব্যক্ত করে বলেছেন,' তাঁর হাতে বাংলা দীর্ঘ কবিতা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। নিয়মিতভাবে এত দীর্ঘ কবিতা সমকালীন সাহিত্যে আর কেউ লিখেছেন কিনা জানা নেই।'

এটা সত্যি যে,কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার তেমন কিছু ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না।ফলে, ব্যক্তি পবিত্র মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে আমার কিছু বলতে চাওয়া বাতুলতা হবে মাত্র। আবার তাঁর কবিতার যে একজন ধারাবাহিক পাঠক ছিলাম সে দাবি করতেও পারি না।ফলে,এ অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যেটুকু আমার বলার অধিকার বা সম্বল তা হল, গত তিন- চার বছর তাঁকে যতটুকু কাছ থেকে দেখেছি এবং তাঁর বেশ কিছু কবিতা পাঠের নিবিড় অভিজ্ঞতা।

দূরবর্তী জায়গায় বাড়ি হবার জন্য লেখালেখি করলেও খুব একটা কলকাতায় আসা হত না। পরবর্তীতে শহরের কাছাকাছি থেকেও যে খুব বেশি কলকাতা আসতাম তাও নয়। সুতরাং, কবি-সাহিত্যিকদের সরাসরি সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল না। তাছাড়া, অন্যান্য অনেকের মতো অনাহুতভাবে কবি-সাহিত্যিকদের বাড়িতে যাওয়া ও আড্ডা দেবার প্রবণতা বা সাহসও ছিল না।কারণ, এক্ষেত্রে একটা ভয় মিশ্রিত সংকোচ সবসময় পাঁচিল হয়ে থাকত আমার সামনে। আজও সেই অভ্যাসে চলমান। ফলে,কবি-শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সৌভাগ্য বলতে (দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া) প্রতি বুধবার নন্দন-বাংলা আকাদেমি চত্বরের গাছতলা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান মঞ্চ। এভাবেই চলতে চলতে পবিত্রদাকে চিনেছি গত তিন-চার বছরে। ধীরে ধীরে তাঁর সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্যও হয়েছে।তাই,আজ তাঁর মৃত্যুর পর লিখতে এসে অনেক ছোট ছোট মুহূর্ত ভেসে এলেও দু-একটি বিশেষ মুহূর্ত এবং তাঁর কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে আমার অনুভূতি ভাগাভাগি করে নেওয়ার চেষ্টা করব আপনাদের সঙ্গে।

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এলাকায় বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পবিত্রদাকে যতটুকু কাছে পেয়েছি সেখানে প্রথম প্রথম 'দাদা, কেমন আছেন?' এই পর্যন্ত কথোপকথনে আটকে থাকত। এভাবে চলছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু, ২০১৯(১৪২৬) সালে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ব্যানার্জিহাট থেকে( কবি অমিতাভ রায় বাড়ি) একটি অনুষ্ঠান শেষে কলকাতা ফেরার পথে পবিত্রদাকে (কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়) অনেকটা সময় কাছ থেকে পাই। গাড়িতে বসেই নানা বিষয়ে কথোপকথন চলছিল তাঁর সঙ্গে। কবিতা সম্পর্কেও তাঁর অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ অমূল্য মতামত শোনাচ্ছিলেন। হঠাৎ কবি প্রবীণ এক কবির প্রসঙ্গ উঠতে তিনি চকিত ফিরে গেলেন নিজের অতীত জীবনে।কিশোর বালকের মতো চঞ্চল হয়ে উঠলেন। বলতে শুরু করলেন নিজের জন্মভূমি বরিশালের আমতলির কথা। মায়ের মৃত্যু হলে কিভাবে মাতৃসমা মাসির হাত ধরে দেশভাগের পর ১৯৪৯ সালে কলকাতায় এসেছিলেন সে সব কাহিনী। তারপর একটানা তাঁর দারিদ্র্যের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা, ছিন্নমূল জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ সংগ্রাম সবই শুনিয়েছিলেন সেদিন। সেইসঙ্গে নিজের কবিতা যাপনের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কথাও শুনিয়েছিলেন আত্মভোলা এক সন্ন্যাসী কবির মতো।আর,গোগ্রাসে গিলেছিলাম আমি।বার বার মনে হয়েছিল, এত দারিদ্রতা, অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন লড়াই, ঠিকানাহীন ভেসে বেড়ানো এপ্রান্ত থেকে সেপ্রান্তে, তবুও কিভাবে কবিতাকে আঁকড়ে রেখেছিলেন! প্রশ্ন করার আগেই তিনি বলতে শুরু করেছিলেন---জানো তাজিমুর, 'অস্তিত্বের কঠিনতম লড়াইয়েও কবিতা ছেড়ে বাঁচব ভাবিনি কোনদিন। আমার জন্ম হয়েছিল যেন কবিতার মধ্যে অবগাহন করতে। সেজন্য হয়তো,এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই আমাকে চিত্র শিল্পের থেকে বেশি করে কবিতা শিল্পের দিকে টেনে নিয়ে গেছিল।তাই, হাংরি

আন্দোলনের মধ্যে থেকেও মানসিক দূরত্ব তৈরি হওয়ায় নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি।এরপর প্রকাশ করেছি 'কবিপত্র' নামে পত্রিকা(সাল১৯৫৭,২৫ বৈশাখ)।তাকে কেন্দ্র করে যেন আমৃত্যু কাটিয়ে দিতে পারি।'

জানতে চেয়েছিলাম,এত কষ্ট,অপমান, অবহেলা সহ্য করেও কবিতার জন্য আত্মবিসর্জন দিয়ে কি পেলেন? উত্তর দিতে গিয়ে তাঁর সেই স্বভাব-সরল ভঙ্গিতে জানালেন, 'কিছু পাবার জন্য তো কবিতা লিখতে আসিনি।যা কিছু লিখেছি ভেতরের দহনজাত যন্ত্রণা থেকে। পাঠকদের জন্য। তাঁদের মতামত, ভালবাসাই তো অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।তাছাড়া, আমি মনে করি কোন প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার কবির শ্রেষ্টত্বের বিচারক হতে পারে না।তাই, যতদিন লিখব পুরস্কারের লোভে নয়, ভেতরের তাগিদে লিখব।'

সেদিনের সেই কথাগুলো থেকে তাঁর মধ্যে যে অদম্য মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছিল তার স্পষ্ট রূপ খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর কবিতায় ও যাপনে। কবিতার জন্য অমরত্বকে ত্যাগ করা যে কথার কথা নয়,তা যেন নিজের কবিতাযাপন দিয়ে প্রমাণ করে দিয়ে গিয়েছেন পবিত্রদা। চিরকাল মানবিক মূল্যবোধকে কবিতায় প্রাধান্য দিয়ে গেছেন। তাঁর কথায়,'কবিদের গদ্যশিল্পীর সামাজিক ভুমিকার থেকে মানবিক মূল্যবোধ থাকবে অনেক বেশি।কারণ,মানুষই তো তার সব চিন্তা-চেতনার উৎস ও আশ্রয়।'('নৌবত' পত্রিকার সাক্ষাৎকার)। চিরকাল শিল্পের বানিজ্যকরণকে তিনি ঘৃণা করেছেন। তাই, দীর্ঘ লেখালেখির জীবনে কখনো লোভের কাছে পরাজয় স্বীকার করেননি। বরং, কবিতার ক্ষেত্রে আপোষহীনহীন থেকে গেছেন আমৃত্যু পর্যন্ত।এটা ঠিক যে,এ রকম মননের জন্য তাঁকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। কারণ, আমার মনে হয়, তিনি যা লিখেছেন সেগুলোর যদি যথার্থ মূল্যায়ন হত তাহলে কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্র পুরস্কার ছাড়াও অনেকগুলো মুকুটের অধিকারী হতেন। আমি তাঁর যতটুকু কবিতা পড়েছি তাতে আমার মনে হয়েছে কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়কে হয় বুঝতে চেষ্টা করা হয়নি নতুবা সব বুঝেও তাঁর কবিসত্তাকে সুপরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে।যা সাহিত্য জগতে অনেক সময় ঈর্ষাকাতরতার প্রকাশ স্বরূপ ঘটে থাকে। কিন্তু, এভাবে যে প্রকৃত কবিত্বকে আড়াল করা যায় না বরং এমন আবহে সেই কবি যে নিজস্ব আলোয় আরও উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন ও স্বতন্ত্রতার অধিকারী হয়ে যান তা পবিত্রদার কবিতার পাঠক মাত্রেই জানেন।কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কথায় যেন এই ভাবনারই প্রতিধ্বনি, 'পবিত্রর অবস্থাটা আমি পুরোপুরি বুঝতে পারি। তথাকথিত বামপন্থী কবিরা তাঁকে কখনোই মেনে নিতে পারবেন না, যেহেতু পবিত্রর কবিতার বহু মাত্রিকতা, শিল্প বৈচিত্র্য, মহাকাব্যিক প্রয়াস ও রক্ত মোক্ষনের কোন বোধ বা অভিজ্ঞতা একমাত্রিকতায় অভ্যস্ত কবিতা পাঠকদের নেই।একই  সঙ্গে উন্মার্গগামী মানুষের সঙ্গহীন শফরী মেজাজের, পরিশ্রমবিমুখ কবিকূল তাকে পরিকল্পিতভাবে এড়িয়ে যাবেন ও নিঃশব্দ,নীরব থেকে মুছে ফেলতে চাইবেন।ঐ দুয়ের মাঝখানে যে-মাটিতে,যে-একক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন,সেটাই তার বাংলা কবিতার খাসজমি।'(রাত্রির স্তবে, ঊষা পানের তৃষ্ণায়)।

স্কুল জীবন থেকে তাঁর যে কবিতাযাপন শুরু হয়েছিল তা অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে থামল ৯ এপ্রিল,২০২১। বাংলা ভাষার 'মহাকবিতা'-র জনকের এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কবিতার একটি ধারার অবসান হল ঠিকই, কিন্তু তিনি যে কবিতাযাপনে নতুন নতুন ভাবনা চিন্তার আগুনটা উস্কে দিয়ে গেলেন তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। বিশ্বাস করি বা না করি কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় যে আজ আধুনিক দীর্ঘকবিতা বা মহাকবিতা-র অন্যতম রূপকার তা তাঁর শবযাত্রা,ভাসান,ইবলিসের আত্মদর্শন', বিযুক্তির স্বেদরক্ত, অলর্কের উপাখ্যান, ভারবাহীদের গান, পরশুরাম পর্ব,জতুগৃহে আছি প্রভৃতি লেখাগুলি পড়লে সহজেই অনুধাবন করা যায়।এই সব গ্রন্থের লেখাগুলিতে কবি তাঁর চিন্তা-চেতনার ঘোড়াকে ছুটিয়েছেন মিথ-পূরানকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতা পর্যন্ত।কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়,'কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় ভাষার নিজস্বতা এখনও সতেজ।তার চিন্তা আমাদের ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতা পর্যন্ত বিস্তৃত।'

তিনি আমৃত্যু কবিতা চর্চা করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে।তাই তাঁর কাছে কবিতা নিছক শব্দের খেলা নয়, বরং তা ছিল জীবনবেদ। সেই বিশ্বাস থেকে তিনি দীপ্ত কন্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন 'হেমন্তের সনেট' কাব্যে এভাবে---'যে কোন শিল্পই হবে রক্ত দিয়ে ফোটানো গোলাপ'।আর তাঁর এই উচ্চারণে সর্বদা যেটি অন্যতম প্রধান তা হল মানবতা।তাই  'যদি যেতে হয়' কবিতায় বলেন--'যদি যেতে হয় তবে যাব ওই মানুষের কাছে/বৃক্ষের ছায়ায় দাঁড়াব না/বৃক্ষ কি   রক্তাক্ত হলে চুম্বনে নিষিক্ত করে মাথা?'। হতাশা, অন্ধকার, যন্ত্রণা, বিপন্নতা,ক্লেদ কবিকে পীড়িত করলেও তিনি চিরকাল আলোর প্রত্যাশী। তাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পড়ে থাকা শরীর ও শবের মাঝেই  মানুষে মানুষে সম্প্রীতি গড়ে তোলার ইচ্ছেকে প্রস্তুত করে আলোময় করে দিয়ে যেতে চেয়েছেন এই সভ্যতাকে। তাঁর কথায়, 'ক্রমশই অন্ধকার হয়ে আসে ফিকে/সকাল হবার আগে পাখিদের অভ্যর্থনা/আর একটি দিনের সূচনাকে,/ আহতেরা ভাবে --এই জীবন কেটেছে দুর্বিপাকে,/ যদি ফিরে আসি ওই মৃত্যুদেশ থেকে/আর নয়, এইখানে ইতি।/মানুষে মানুষে সম্প্রীতি/গড়ে দিতে ইচ্ছের সূচনা/করে,তবে যাব।' (চৈতন্য আমাকে দাও)। আবার,এভাবে চলার পথে যদি কখনো দেখেন, মানুষ ক্রমে পণ্য হয়ে যাচ্ছে,যন্ত্রের মতো প্রভুর দাসত্ব করছে, কিংবা মনুষ্যত্ব খুঁজে না পাওয়া যায় তাহলেও তাকে জীবনের পরিণতি হিসেবে মেনে নেবেন। তারপরেও আত্মপ্রত্যয়ী মন নিয়ে ইতিহাসের বাঁকে উত্তরণের পথের খোঁজে এগোবেন বলে তাঁর দীপ্ত ঘোষণা--'আজ পৃথিবীর অনগ্রসর আলোর ভিতর যদি বা উদগত/সহস্রদল পদ্ম-প্রতিম মানুষ ও ঈশ্বরী /না পাই খুঁজে, মানুষ যদি শুধুই হয় পণ্যযুগের হিসেবনিকেশ,যদি/ইলেকট্রনিক যন্ত্র হয়ে প্রভুর ইচ্ছে মতো /বেজে ওঠার সহজ সুখে বাজতে থাকে,বুঝব--আমাদেরই /এই পরিণাম। ইতিহাসের পথের বাঁকে/দাঁড়িয়ে পথ খুঁজছি উত্তরণের।'(শ্রেষ্ঠ কবিতা )।এই উত্তরণের খোঁজে তিনি সবসময় পথে নেমেছেন

কারণ,পথই তাঁকে টানে। কিন্তু মুক্তি কোথায় তাঁর জানা নেই।তা বলে তিনি থামার পাত্র নন।তাই, পতনের বীজগুলি নতুন করে খুঁজে দেখতে চান তিনি।কারণ,শর্তহীন মেষীর জীবন তাঁর অপছন্দের-- 'আমরা আবার খুঁজতে থাকব দুঃখগুলির বীজ আমাদের পতনের/এই নতমুখী মেষীদের জীবন মেনে নেবো না শর্তহীন' (বিযুক্তির স্বেদরক্ত,৮ম সর্গ)।সেই সঙ্গে তীব্র সময় সচেতন কবি চিরটাকাল সময়ের বুকে আশ্রয় নিয়ে শান্তি পেতে চেয়েছেন।কারণ,তার মতে সময়ই শ্রেষ্ঠ প্রেমিক, এমনকি ঈশ্বরও-- 'অতএব হে সময়/তোমার সর্বজ্ঞ শান্ত বুকে/মাথা রেখে শান্তি চাই/তুমি হও শ্রেষ্ঠ ঈশ্বর।'(শবযাত্রা' কাব্য)।

সাদামাটা ও সম্পূর্ণ আড়ম্বরহীন জীবনে অভ্যস্ত তাঁর ৮১ বছরের জীবনটা যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র । জীবনের সোনালী সময়ের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর ছিল চরম দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই।মাত্র সাত বছর বয়সে মা-কে হারিয়ে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ক্রমে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলালেও থামেনি কখনো।হার না মেনে দৃঢ়পায়ে এগিয়ে গেছেন সময়ের সঙ্গে লড়াই করে। পাশাপাশি কবিতায় নিবেদিত প্রাণ এই কবি চিরকাল শিকড় সন্ধানে বিশ্বাসী থেকে মাটির নিরাময়ও প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু কিভাবে পেতে হয় তা তাঁর  অজানা থাকায় সংশয়-দ্বন্দের মধ্যে অনবরত ছুটে বেড়িয়েছেন। কারণ, তিনি জানতেন এই অন্বেষণের দায় শুধুমাত্র শিল্পীরই।তাই চরম বিপন্নতার মধ্যেও তাঁর জার্নি ছিল আলোর দিকে--'জীবনকে ভালবেসে নিরন্তর ক্ষয়ে যেতে পারি/নির্ভার শান্তিতে গেঁথে আলোকিত মুহূর্তের মালা,'(কাকে যে প্রেমিক বলি)।

যামিনী রায়ের ছবির মতো পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা কবি তাঁর বিপন্নতা, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, হতাশা, দ্রোহ প্রভৃতি তাঁর লেখায় মূর্ত করেছেন বারবার।সেজন্য তিনি মাধ্যম করেছেন যতটা না ছোট কবিতাকে তার থেকে অনেক বেশি  'মহাকবিতা'কে। একটার পর একটা দীর্ঘকবিতা লিখেছেন। আর কবিতপাঠক থেকে বিজ্ঞজন, এমনকি অগ্রজ-অনুজ কবি--সকলকে স্তম্ভিত করেছেন।তাই তাঁর লেখা 'ইবলিসের আত্মদর্শন' পড়ে স্তম্ভিত হয়েছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। 'শবযাত্রা' পড়ে কবি কালীকৃষ্ণ গুহ সেসময় সাম্প্রতিক কালের কবিতার ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলে দাবি করেছিলেন। আসলে, 'মহাকবিতা' তাঁর জীবনে যেন একটা উদ্ভাসের মতো আলোকচ্ছটা।যার মাধ্যমে একমাত্র প্রকাশ করা সম্ভব চেতন-অচেতনের আলো-অন্ধকারময়তার রূপকে বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। তাঁর কথায়, ' মানুষের মন একমুখিন নয়, কখনো তার চেতনার স্তরেও থাকে নিশ্চেতনার, নিজ্ঞানের আলো অন্ধকারের খেলা; মিশ্র জটিল চৈতন্যের প্রকাশ কবিতার কাছে দাবি করা হয় যদি,তার যোগ মাধ্যম অবশ্যই দীর্ঘকবিতা, আরও একধাপ এগিয়ে জীবনানন্দের সংজ্ঞায়িত মহাকবিতা'(প্রসঙ্গ: দীর্ঘ কবিতা সত্তার সাম্রাজ্য ও কবিতা)।

জীবনানন্দীয় মহাকবিতার কথা মাথায় রেখেও বলা মনে হয় সঙ্গত হবে যে, পবিত্র মুখোপাধ্যায়ই প্রথম মহাকবিতা লিখে উনবিংশ শতকের প্রবহমান দীর্ঘকবিতার ধারায় নতুনত্বের ছোঁয়া দিলেন। তাঁর পুর্বে যে সমস্ত দীর্ঘকবিতা লেখা হয়েছে তাতে কোন আত্মক্ষরণ বা আত্মজিজ্ঞাসা ছিল না।পবিত্র মুখোপাধ্যায় সেখানে প্রথমে এই বৈশিষ্ট্যের উদ্রেক ঘটালেন।যা তাঁকে সমকালীন পাঠকদের কাছে মহাকবিতার 'জনক' হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। এমনকি আগামীদিনেও পাঠকদের কাছে এমন সৃষ্টির জন্য চির উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। তাঁর অনুজ কবি গৌরশংকর বন্দোপাধ্যায়ের কথায়, '....ষাট দশকের কবিতায় তাঁর এই আখ্যানধর্মী মহাকবিতা উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের দ্যুতিতে উজ্জ্বলতা নিয়ে থাকবে--এই মহাকবিতা হবে কবিতার এক অনন্য ঐশ্বর্য--যে ঐশ্বর্য বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবে সূর্যরশ্মির উজ্জ্বল আলোর মতো।' আসলে মহাকবিতায় পবিত্র মুখোপাধ্যায় যতটা সাবলীল ভঙ্গিতে নিজের দ্রোহকেন্দ্রিক ক্ষরণজাত উপলব্ধি বলতে পারতেন অন্য আঙ্গিকে ততটা হয়তো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি।তাই, 'শবযাত্রা' থেকে 'অলর্কের উপাখ্যান' ছুঁয়ে 'পরশুরাম পর্ব'--সব ক্ষেত্রে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত। যেখানে ধরা রয়েছে কবির সময়কালীন যন্ত্রণা, হাহাকার, ক্রোধ, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ প্রভৃতির কথা অত্যন্ত সুচারুভাবে।আর,এ সব নিয়ে ইতোমধ্যে বহু বিজ্ঞজনের লেখায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন ভাবে।তাই নতুন করে এখানে সে বিষয়ে উল্লেখের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।পাঠক ইচ্ছে করলে অন্যত্র তা পড়ে নেবার সুযোগ পাবেন। আমি শুধু এখানে প্রসঙ্গভাবনাকে বোঝানোর জন্য 'অলর্কের উপাখ্যান' থেকে দু-একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করার চেষ্টা করব মাত্র। তিনি ইবলিশকে নিজের আত্মবর্ম করে সমাজে নতুন কিছু নির্মাণের লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংসকারী আগ্রাসী সভ্যতার মূলোচ্ছেদের স্পৃহাকে। আর ওই একই ভাবনার সূত্রে "অলর্কের উপাখ্যান"-এ কবি তুলে ধরেছেন অলর্কের আর্কিটাইপে ব্যক্তিমানুষের ভিন্ন ভিন্ন ইন্দ্রিয়জ বৈশিষ্ট্য। কিভাবে একক ব্যক্তি সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য,ভোগ শেষে নৈরাশ্য ছুঁয়ে আমিত্বকে সরিয়ে উত্তরণের পথ খোঁজে সে কথা বলা হয়েছে এখানে। ফলে,কাব্যে অলর্কের ঔদ্ধত্য, হতাশা, বিষাদ আসলে যেকোনো ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরই যে অনুভূতির প্রতিরূপ তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না।তাই, কাব্যের শুরুতে অলর্করূপী যে কবি বলেন,'আমি বর্ষায় নক্ষত্র গেঁথে নেবো     আমি/ শান্তি কেড়ে নেবো তাদের     আমাকে যারা কুর্নিশ করে না'। আবার শেষ দিকে সেই ক্রোধ হতাশায় পরিণত হলে কবি বলে ওঠেন,'হায় প্রিয় ইন্দ্রিয়, প্রতারিত করেছো আমাকে/ মনুমেন্টের উপর থেকে কলকাতা দেখেছি আমি/গঙ্গার উপর ভাসমান রেস্তোরাঁয় পেতেছিলাম আমার সাম্রাজ্য/শোক আর নৈরাশ্য, ভাঙাহাঁটুর দালাল,সর্বশান্ত বেশ্যা/থুবড়ে পড়া কেরানীর উদ্ধত উচ্চাশা/এই সব থেকে পড়ে আছি অনেক দূরে.....'। 

এভাবে বলার পাশাপাশি,কিভাবে মহৎ কাজের নামে রাজনীতিকরা বা ক্ষমতাসীনরা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে আত্মসমালোচনা না করে নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যুতি, অপরাধের জন্য ক্ষমতাহীনদের দায়ী করে তোলেন সে প্রসঙ্গও সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন এ কাব্যে--'নিজের গুহায় বন্দী কোরেছো পৃথিবী, নিজের খিদেয় জ্বালিয়ে দিয়েছো খান্ডববন/আর দায়ী করেছো আমাদের, পরজীবী ইন্দ্রিয়ের'।

এসবের পরেও কবি নিশ্চিত যে জীবনের শেষে ইন্দ্রিয়জ এই সকল ভাবনাগুলো কিছুই থাকবে না। ব্যক্তিমানুষ আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়েই একদিন না একদিন উত্তরণে পৌঁছে যাবে। আর তখন তার দম্ভ, ক্ষমতা প্রভৃতি যে অসার মনে হবে তাও বলেছেন কবি,'এ তোমার অসার দম্ভ,ভ্রান্তিময় আস্ফালন,অলর্ক।' তবে, সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক এই বিষয়গুলো সংশোধিত না হলে যে বংশ পরম্পরায় সেই ভ্রান্তির পুনরাবৃত্তি হয় তাও স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন কবি। আসলে পরোক্ষে অলর্কের মাধ্যমে আমাদের সমাজের ভন্ড রাজনীতিক, ক্ষমতালিপ্সূদের প্রতি চাবুক চালিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, 'পিতামহের মশাল বহন কোরেছেন পিতা,আর তিনি দিয়েছেন তোমাকে/সেই আলোয় দেখছো পথ, বাড়িয়ে দিচ্ছো হাত/চালনা কোরেছো পা ওদের ফেলে যাওয়া পায়ের দাগ লক্ষ্য কোরে/আর ওই মশাল,তুলে দিচ্ছো তুমিও আত্মজেরই হাতে'।এ যেন এই সমাজব্যবস্থার এক জীবন্ত অধ্যায়। অবশ্য তিনি














জানতেন এভাবে চলতে থাকলে ভুলের পরিমাণ বাড়ে বই কমে না। জীবনে সহজভাবে চলাও রুদ্ধ হয়ে পড়ে।তাই, তাকে সমূলে উৎপাটন করতে ডাক দিয়ে বলেছেন, 'ভ্রান্তির জনক যে ভ্রান্তি, তাকেও/উচ্ছেদ করো সত্তার মূলদেশ, কান্ড, বীজপত্র/পোষাক দাও বিলিয়ে,বর্শা ভেঙে বানিয়ে নাও কুঠার/রথের চাকায় ট্রাকটর করো নির্মাণ/মিনার থেকে নেমে এসো অলর্ক,সমতলে বানাও ঘরবাড়ি/সহজ পায়ে হাঁটতে থাকো ধুলায়'।ক্ষমতার চূড়ায় বসে থেকে সহজ জীবন যাপন যে সহজ নয় তা কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় ভালোই জানতেন।কারণ, ব্যক্তিমানুষ তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অহমিকা, ক্ষমতার লোভ সহজে ছাড়তে পারে না।সেগুলোকে মুকুট করে নিজেদের দাম্ভিক হিসেবে গণ্য করার চেষ্টা করে।অথচ,সবাই জানে তা ক্ষণস্থায়ী।একদিন না একদিন সব মিশে যাবে ধুলায়।কবি তাই বলেছেন এভাবে, 'মুকুট আর মিনার ধুলোয় যাবে মিশে/মিলিয়ে যাবে পতাকা,রাজদন্ড আর সিংহাসন/ফিরবে যখন নতুনজন্মে কুমারী মায়ের কোলে/বলবে, দ্যাখো---ওই আমাদের প্রভু'।

প্রায় সমস্ত জীবন ধরে বিভিন্ন লেখায় ক্রমাগত আত্মখননের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের কবিত্ব শক্তিকে এমন একটি জায়গায় তুলে নিয়ে গেছেন যা ছোঁয়া যে কারোরই পক্ষে কঠিন। সেখানে যেন কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই।যেন নিজেই নিজের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। 'রাত্রির স্তবে,উষা পানের তৃষ্ণায়' নামক প্রবন্ধে কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কথায়ও যেন সেই কথারই প্রতিধ্বনি, 'তিনি এমনি এক কবি,যাঁর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ফলে,তাঁর নিয়তি,হয় তাঁকে প্রাক্তন পবিত্রকে হারাতে হবে,না হয় ঐ প্রাক্তনের কাছে পরাস্ত হতে হবে।' ফলে, সব মিলিয়ে কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় তাঁর  "মহাকবিতা-র" জন্য একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী কবি হিসেবে বিরাজ করবেন পাঠকহৃদয়ে।
























Comments

Popular posts from this blog

কবি বৃন্দাবন দাস

কবি প্রতাপ সিংহ