কবি মৌমন মিত্র


 মৌমন মিত্র

কবি এবং গদ্যকার মৌমন মিত্র থাকেন আমেরিকার নিউ জার্সি শহরে। বিদেশে থেকেও তিনি বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন দৈনন্দিন। ইংরেজিতে লেখালেখি করলেও বাংলা ভাষাই তার প্রিয় চারণভূমি৷ আনন্দবাজার পত্রিকা, সানন্দা, হ্যালো টেস্টিং বাংলা কবিতা, সংবাদ প্রতিদিন, এখন শান্তিনিকেতন সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত কবিতা, গল্প ছাড়াও নানা বিষয়ে গদ্য লেখেন তিনি।'শ্যামকাঞ্চন' তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ।প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ — ‘দ্বিচারিণীর কফিদানা' এবং ‘মদ ও মেলানকলি'।প্রকাশিতব্য গদ্যের বই - ' কুয়োতলার কলকাতা’।কন্যা, পুত্র ও স্বামীকে নিয়ে সাজানো ও কৌতূহলী প্রবাসে তাঁর অন্যতম আরেক যাপন রবীন্দ্রনাথ।


গুচ্ছ কবিতায়
কবি মৌমন মিত্র















সহজ:১ 


শহরের ফেনা লবঙ্গ ভাত ও ধূসর টেক্সটকথাগুলি 

আর-একবার সহজ করে নাও,সহজ যে একা 

একাকিত্বের মিথ্যে পাকানো জটিল মানচিত্র,মেলে দাও 

ক'টি অলিখিত বিন্দুর কেন্দ্রে চাঁদ কোথাওই,যদি হয় 

হয় না সপ্তকসুর? আলো ঝলমল কাছে,কোথাও-বা বহু দূর 

ইহ সংসারের সমস্ত দেহ যেন শূন্য মাঠে ঘুরে ঘুরে,সবক'টিই 

মেট্রোর বেহালা..অচেনা ড্রয়ইং খাতায় ছবির দরজা জানলা 


জিভের ট্রাফিকে হাজার মাইল এলোপাথাড়ি নাভির রোম 


নদীটিও ওড়াওড়ি,কতদিন শুষে নেয় গুড়ের ঘন ঘন আঠাস্রোত 

যেন-বা এই পর্বের শেষ বুঝে চোখঠারে বেদনা বেড়াল,আশান্বিত 


তাকে তুমিও কি দেখব দেখব বলে চলে যাও একদিন?এ নিছক 

বৃষ্টির সোঁদা পাক,বহুদিন।সনেটে হাফ ছেঁড়া স্যান্ডোর বিলিতি ফ্রেম।

পুরনো আঙুরের বিষ পান করে কত-যে বলে বেড়ায়,এও তো উপশম 

শরীর ভরা ঘুমের ঘোর..রাতের ছলে আসে না।বলো,আসে নাকি?


রাত আর রাত ভরা নিরিবিলি ছাত।কত অক্ষরের রশ্মি থেকে 

ধুপধাপ ঝাঁপ দিই, প্রলেপ তত।দু'একটি বাতাসে ছড়ানো হয়তো-বা 

স্থির..বহু কষ্টে ছিন্ন করি মেঘখেলার দিন।চেটে চলে গেছে গলিপথ 

জলছন্দ রেখার টানে আর-বা ফিরেও দ্যাখে না,হায় ফেরায়নি সেও! 


ইলোরার বাতায়নে তখন আড়াআড়ি মিলিয়ে গ্যাছে ঘরদোর 

বর্ষাতির পকেটে ঝুলে থাকা ফেরার দিন..যত যা জমা বইপত্তর!


সহজ:২


একটি দুটি গর্তের চিহ্নে কোথাও পথ যেন 

ইট ও দু'ফালি ডানার বাঁ পাশে,চলি এভাবেই 

মরণের জন্য সাঙ্গ করেছি মাটির সৈকত -- মেঘবৃষ্টির আঁচল 


কেবল মোহে মিহি সুতোর ঢালু গা বেয়ে 

নেভানো গ্লোব সিনেমার ম্যাজিক বিস্ফার পড়ে থাকে,জন্ম নেয় 

সময়ের চিকন শিরায় দুরন্ত ছবির বেণীও তা জড়িয়ে দিতে পারে 

তার আকারে গাছেদের অঢেল ধুলো ছাপ,এই করতলে 

কেউ তাকে গর্তের মধ্যে ঢেলে পান করে--কেউ হেলায় খণ্ড করে একদিন 

সেসব টুকরো আধ লেখা বানান-- আমি শুধু তার চিহ্নে ভর করি 


ঘাস পাতা ঘন হয়েছে হাজার হাজার জমা রঙের প্রাচীন ঢেউয়ে 

মনে পড়ে আমিও টের পেয়েছি বহুবার।ভেসে উঠেছি বুনো হাড়গোড়ের উঁচু উঁচু পাহাড় কেটে কেটে..বিস্ময় ! বা অতিবিস্ময়ে! 

কোথাকার গ্রীক শালুক ফুলের বর্ণ সে? কবে কাঁধে চেপেছে তার ছিটেফোঁটা রোদ্দুরের বেপরোয়া বিষবাণ? স্তবকে রাখা যা আছে ---


নাকি এতকিছু না-ভেবে সময় ফিরছে প্লুটোর আগে,দ্রুত লয়!

তা  ছুঁয়ে অজস্র ফেনার নিশি ঘাট,পাথর টুকরো ব্যবধান 

দেখতে থাকি -- পড়তে থাকি ভাষাহীন তম্বুরার কুহু কুহু সুর 

তারই অনেক অংশে হাঁসের ঠোঁটবিন্দু ক্ষ'য়ে গ্যাছে,তারাহীন 

আবার মিলিত হয়েছে লিন্ডসে স্ট্রিটের মধ্যিখানে

ঠিক তখন দক্ষিণ বারান্দার কোণ দিয়ে পাশাপাশি উড়ে যায় 


পিকাসোর সাজ-ক্যানভাস...অলেখা সনাতন ফাটলের তরল রাত


সহজ:৩


তুমি ডালপালা দাও 

এই সেদিন নদীর ছাউনি উবে গেছে রাত্রির নেশায় 

ঘর বাড়ি তার শূন্যে আম্রপল্লবের জল জল ফোঁটা দিল 

তখন গাঢ় সিঁদুরি দাগ অমানিশার চৌকাঠে,গ্রহ চিন্তা 

অজানা ভয়,হারাবার?বোঝো না যে এও পলাশের ঋতু 

আধভেজা স্লেটের মৃদুমন্দ বিকিরণ? রুপালি চন্দন? 

যে দিক সূর্য চায় বার বার; তৈরি করে দু'চার তিমিরের বৃত্ত 

তাকে ঠুকরে ব্রততীর মেঘ-ও ডুবে যাবে..কোনও একদিন 

মনে মনে আলোয় ফেরা সেও..তিনি ফিরবেন কি আদৌ? 

প্রশ্ন শুধু প্রশ্ন করে সংকেত, প্রশ্ন লেখা পালকের ঝুমুর কথন 

পৃথার ছায়া দেখা যেত যদি, থাকত যদি রুক্ষ বালির স্তন!

যদি অচেনা পরবাসে সৃষ্টি হত অক্ষয়.. অন্য সূর্যের সময় 

তুমি তা ছায়াময় শরীরে কথা দিও-- আমি তাতে রক্তগর্ভ খুঁজব  


দেখবে মহা মহা সময়ের ভুল ঠিকানাও এভাবে গিঁথে যায় 

বৌবাজার স্ট্রিট থেকে লি-রোডের উড়ন্ত ঘূর্ণির চাকায় 

রোদের ছোট্ট বিন্দুর অধরে তীব্র বিদ্যুৎ প্রয়াস ছিল,তুমিও 

অচিরে তার সুখটান থেকে বঞ্চিত করেছ দু'কলম কালি 

এভাবে সাহারাকে জঠরে বেঁধে নিও..চলে যেও দূর সীমানায় 


কবিতাজলে স্নান সেরে উঠে বুঝেছ সে জলে ক'পলি মাটি থাকে? 

ঠোঙার গর্ভে নিউজপ্রিন্ট-আকাশ দেখছি দাঁড়িয়ে,বিদায় আসর 

সেখানে শ-দুই বিস্মৃত মোহের চিহ্ন লিখতে-লিখতে আজ ভাবি 

একেকটা অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির মেঘবাণী ছটফটানি,এমন 


কালভার্ট আঁকা বৈদ্যুতিক চলচ্চিত্রে মস্ত পৃথিবীর মলাট জমা 

দু'তিনটি সান্ধ্যতটে আমরা গৃহবন্দি যখন!










Comments

Popular posts from this blog

কবি শোভা চন্দ

কবি-প্রাবন্ধিক তাজিমুর রহমান

কবি বৃন্দাবন দাস