কবি-প্রাবন্ধিক বিমল মন্ডল


 বিমল মন্ডল

জন্ম:- ১০ই ফেব্রুয়ারি।পশ্চিমবঙ্গ, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার শেষ  সীমান্তে খেজুরী থানার অন্তর্গত -চৌদ্দচুলী গ্রামের অতিশয় দরিদ্র এক পরিবারে।দারিদ্র্য আর অভাব যার নিত্যসঙ্গী, আর মা-ই ছিল তাঁর দর্শন। ২০০৬ সালে স্কুলে শিক্ষক পদে নিযুক্ত। তাঁর প্রকাশিত  কাব্যগ্রন্থগুলো হলো অর্পণ(২০০০),ফিরে পাওয়া কবিতা (২০১১), শিরোনাম নেই(২০১২), আকাশ তুমি জানো (২০১৪), বিশ্বাসের চুপকথা (২০২০),বৃষ্টি আজ মেঘের আড়ালে (২০২০),সরোবরের ভেতর  চাঁদ(২০২০), কথালিপি (২০২১),এক পশলা মায়া বৃষ্টি (২০২১),রোদের কোনো অক্ষর নেই (২০২১)। এছাড়া কাব্য সংকলনগুলি হলো শব্দ প্রতিমার আকাশ (২০১৪) কবিতার  হৃদয় হৃদয়ের কবিতা (২০১৫), সম্পাদিত পত্রিকা শব্দ যখন(২০২০),দশের বারান্দায় একুশের রোদ (২০২১), রক্তের ভেতর হেঁটে যাই (২০২১) এবং  কাজী নজরুল ইসলামঃ কবি ও কাব্য(২০১৩) নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন।এই প্রবন্ধের জন্য  জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার পান ২০১৪ তে। এছাড়া নিয়মিত ছোট- বড়ো  সব পত্রিকায় কবিতা, গল্প,প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।সম্পাদিত পত্রিকা অঙ্কুরীশা।প্রিয় নেশা-    বই পড়া। ছেলে - মেয়ের সাথে সময় কাটানো এবং নিম্নবর্গের মানুষের জীবন ভাবনা , শিক্ষা সংস্কৃতি ও ভাষা সংগ্রহ করা।

©/কবির সঙ্গে, কবিতার সঙ্গে








সংশয়ী মানবতার প্রতীকঃপ্রসঙ্গ জীবনানন্দের দাশের কবিতা


বিমল মণ্ডল 


কবি মাত্রই অনুভূতিপ্রবণ সামাজিক অস্তিত্ব। চলমান সমাজ নানা পরিবর্তনের ইঙ্গিত ধরে বয়ে চলে,কবির হৃদয় যেন এই পরিবর্তনের  ছায়াধারী দর্পণ।সমাজ জীবনের পরিবর্তন কবির মনোদর্পণের প্রতিবিম্বিত হয়।প্রখ্যাত কবি টি.এস এলিয়ট বলেছেন — "সমাজ জীবনের পরিবর্তন কবির চিন্তা জগতে পরিবর্তন আনে।" —এই সূত্রটি জীবনানন্দের  পক্ষে প্রযোজ্য এবং জীবনানন্দের মনোজীবিনের ক্রমবিবর্তন লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে,সমাজ জীবন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কবির মনোজীবনে যুগের প্রতি আনুগত্যের ও সংশয়ের পরিবর্তিত কাব্যরূপ লক্ষ্য করা যায় 'ধূসর পাণ্ডুলিপি ' সমাজ জীবনের এক পরিবর্তন ক্রান্তিলগ্নে আবর্তিত।

সাহিত্যের পরিভাষায় এই যুগকে 'কল্লোল যুগ' বলা চলে। এই যুগ,অচিন্তকুমার সেনগুপ্তের মতে, সর্বতোমুখী পরিবর্তনের আঙ্গিকে, বিষয় ভাবনার সংশয় ও প্রকাশরীতির এক অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্যের সমুজ্জ্বল। এই যুগের  উল্লেখযোগ্য  কবি যিনি সমাজজীবনে  পরিবর্তনের  ইঙ্গিত ধরাপড়েছে তাঁর  কবিতায়। 


জীবনানন্দ পূর্ববর্তী বাংলা কাব্যের অবিসংবাদিত কবি পুরুষ রবীন্দ্রনাথের কাব্যে প্রেমের বর্ণনায় যে মোহাবেশ,যে উচ্ছ্বাস লক্ষ্যগোচরঃ জীবনানন্দের কাব্যে যে প্রেম সংশয়ের দৃষ্টিতে  অবলোকিত। যে প্রেম তিনি পান নি, যে প্রেম শেষ হয়ে গেছে, যে প্রেম কোনদিন ফিরে আসবে না — জীবনানন্দ সেই অচরিতার্থতার কবি।'ধূসর পাণ্ডুলিপি' কাব্যগ্রন্থের 'প্রেম' কবিতায় কবির এই বিদায় ব্যথার রাগিণী  শোনা যায়।পূর্ববর্তী রোমাণ্টিক কাব্যে


বিরহ অনুভূতির মধ্যে  ক্ষণিক মিলনের বিদ্যুদ্দীপ্ত লক্ষ্য যায়;কিন্তু জীবনানন্দের কাব্যে তা অনুপস্থিত। 'সাতটি তারার তিমির ' কাব্যগ্রন্থেও কবির এই বিরহব্যথা গুঞ্জরিত, মূর্ত হয়েছে—



'সুরঞ্জনা

তোমার হৃদয় আজ ঘাস

বাতাসের ওপারে বাতাস

আকাশের ওপারে আকাশ।'


পূর্ববর্তী কবিদের কাব্যে যে প্রেম বহুমুখী প্রসারিত হত, আধুনিক কাব্যে তা সামাজিক ও কঠিন রূপ ধারণ করেছে। এই প্রসঙ্গে 'হায় চিল' কবিতা ধরা পড়ে —


'হায় চিল

সোনালী ডানার চিল

এই ভিজে মেঘের দুপুরে

তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে

ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে।'


এখানে ' ভিজে মেঘের দুপুর' আর চিলের  উদাস ডাক সংশয়ক্ষুব্ধ  জীবনের পটভূমিকায় এক অপরিসীম ব্যঞ্জনার স্থিরভূমি নির্দেশ করেছে।

ক্লান্তি এবং বেদনাক্ষুব্ধ হয়ে  জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় কবি কীটস্ মৃত্যুর অতলে বা ক্লান্তির গর্ভে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চেয়েছিলেন। জীবনানন্দের কাব্যেও এই ক্লান্তি বা মৃত্যু চেতনা  যুগসংশয়ের উত্তাল তরঙ্গ থেকে আত্মরক্ষা করার  এই

সুদীর্ঘ প্রাচীর। অবশ্য জীবনানন্দের মৃত্যু চেতনা দৈহিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জাগ্রত হয়নি।যুগের বন্ধ্যারূপ, অচিরতার্থ জীবনের ক্রন্দন এবং এর পাশে পাশে সমৃদ্ধতার পূর্ণতার জীবনের আশ্বাস  জীবনানন্দের কাব্য চেতনায় মিশ্রিত হয়ে আছে।কবি জানেন, তাঁর পরিচিত জগৎ স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাই শরীরী চেতনাকে অবলম্বন করে কবি জীবনানন্দ 'বিভিন্ন কোরাস' কবিতায় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন—


'পৃথিবীতে ঢের দিন বেঁচে থেকে  আমাদের আয়ু

এখন মৃত্যুর শব্দ শোনে দিনমান। '


তবুও কবি জীবনানন্দ এবং তাঁর যুগের মানুষেরা এসে উপনীত হয়েছেন নতুন এক জীবনের মূল্যবোধ,যদিও  আগের যুগজীবন এবং বর্তমানের সংশয়ক্ষুব্ধ  জীবন কবির মনোভূমিতে এক দোলাচল চিত্ততা প্রস্ফুটিত হয়েছে। তারই কারণে ঘোষিত হয়েছে —


'আমরা তো তিমির বিনাশী  হতে চাই

আমরা তো তিমির বিনাশী। '


অতীতের সেই অনড় বিশ্বাসকে  ত্যাগ করে কবির চেতনা আজ রোমান্টিক মনের স্বাভাবিক প্রেরণায় ইতিহাসের ধূসর জগতে অভিসার করেছে। অশোকের বিম্বিসারের ধূসর জগতে তার যাত্রা শুরু করেছিল। ইতিহাসের কল্পলোকে কোমল  অনুভূতির গভীরতা অবগাহন করে যুগের যন্ত্রণা ও সংশয়ের বন্ধ্যা অস্তিত্ব বলে মনে করেছেন। যুগের সর্বাতিরিক্ত নিঃস্বতা, রিক্ততা, ক্ষয়িষ্ণুতা চারদিকে এক প্রাণহীন 'ওয়েষ্ট  ল্যাণ্ডে' পরিনত করেছে । যেখানে সূর্য  নয়, বাঁশ পাতা, শিশিরের জল এ সমস্ত প্রত্যক্ষ করা যায়।যুগের এই ক্ষয়ের রূপ কবির দৃষ্টি এড়ায়নি। বেদনাক্ষুব্ধ  দৃষ্টিতে তিনি 'ধূসর পাণ্ডুলিপি ' কাব্যগ্রন্থের 'অবসরের গান' কবিতায় বেদনার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেছেন — 


"আমি সেই সুন্দরীরে দেখে নেই - নুয়ে আছে নদীর এপারে 

বেরোবার দেরি নেই - রূপ ঝরে পড়ে তার - তার শীত এসে নষ্ট করে দিয়ে যাবে তারে।''


সাধারণত এটাই কবি জীবনানন্দের সংশয়ী মানবাত্মার সামান্য কিছু পরিচয়। অবশ্য কোন কবি একটি মাত্র আঙ্গিকে বিচার্য হতে পারেন না কবির চোখ একদা যা ছিল মহামিলনের মিলনতীর্থ, যুগের পরিপ্রেক্ষিতে - ইতিহাসের পরিবর্তন সেই দেশ এবং কাল সংশয়ের অগ্নিদৃষ্টিতে লক্ষিত হয়।এরই বাণীবদ্ধ রূপ প্রকাশিত হয়েছে —

"বাজার দরের বেশি কালো টাকা দিয়ে 

জীবনকে পাওয়া যাবে ভেবে

যেন কোন জীবনের উৎস সন্ধানে তারা সকলে চলেছে 

পরস্পরের দূরে থেকে ছিন্ন হয়ে বিরোধিতা করেছে।"


আবারও দেখা যায়  'ধূসর পাণ্ডুলিপি' কাব্যের 'রূপসী


বাংলা' পর্যায়ে জীবনানন্দের প্রেমচেতনার দুটো বিপ্রতীপ বিন্দুতে আবর্তিত। একদিকে, প্রেমের ঐশ্বর্যময় আবির্ভাবের রোমহষর্ক  নৈসর্গিক প্রেক্ষাপটে সংশয়ী মানবাত্মার সুর শোনা যায়—



'যখন সবুজ অন্ধকার,

নরম রাত্রির দেশ,নদীর জলের গন্ধ কোন এক নবীনাগতার

মুখখানা নিয়ে আসে — মনে হয় কোনদিন পৃথিবীতে প্রেমের আহ্বান

এমন গভীর করে পেয়েছি কি?'


এখানে যেন পৃথিবীর শূন্য পথে  ফিরে পায় গভীর শিহরণ। আবার অন্যদিকে, বিচ্ছেদ কাতরতা, নশ্বরতার বেদনা, অচরিতার্থতার ভারাক্রান্ত দীর্ঘশ্বাস ধরা পড়ে। যেমন—


শরীরে নদীর ছিরি,— ছুঁয়ে দেখো — চোখা ছুরি, ধারালো হাতির দাঁত

হাড়েরই কাঠামো শুধু, — তারমাঝে কোনদিন হৃদয় মমতা ছিল কই!


'সুচেতনা' কবিতায় — 


'দেখেছি যা হল হবে মানুষের যা হবার নয়

শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলেই অনন্ত সূর্যোদয়।'


ইতিহাসের অন্তর্গূঢ় শক্তিগুলি এই সভ্যতা থেকে নতুন সভ্যতার অর্থহীন চক্রাবর্তে মানব সমাজকে পৌঁছে দেয় না, উত্তরিত করে দেয় ইতিহাসের ঘনঘটার মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতার উত্তরণ প্রয়াসের বিশ্বাস দীপ্তি।অথচ তার তেমন গভীর রেখাঙ্কিত নয় কবির মননে।তাই ইতিহাস বোধ যেন এক সংশয়ী মানবতার উজ্জ্বল পরিনতি পেয়েছে। 

আধুনিক জীবনের সমাজ— জীবনানন্দের দৃষ্টিতে এই ভাবেই উদ্ ঘাটিত হয়েছে। সুতরাং বলা চলে, নির্জনতার  অঙ্কুশ তাড়নায় ক্ষুব্ধ হয়ে সংশয়ের বেদনায় তাপিত হয় জীবনানন্দ তাঁর কাব্যের অন্তিম পর্যায়ে এক দূরতম অন্তিম দ্বীপের অস্তিত্ব অনুভব করেছিলেন — যেখানে সকল সংশয়, সকল  যন্ত্রণা নির্জনতার আচ্ছাদনে আবৃত থাকে। জীবনানন্দ তাই বাংলা সাহিত্যে এক দূরতম দ্বীপ — যেখানে সংশয়ী মানবাত্মার আর্ত - ক্রন্দন ধ্বনিত।


Comments

  1. কবি ও সম্পাদক বিমল মন্ডল মহাশয়ের জীবনালেখ্য পড়লাম। জীবনের শুরুতে
    চরম দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়েছেন তিনি।
    কিন্তু তাঁর মায়ের আশীর্বাদ ও স্নেহ ভালবাসা
    তাঁকে ও তাঁর ভাই বোনদের পরম মমতায়
    আবিষ্ট করে রাখে। এবং মায়ের আশীর্বাদের
    জন্ম তিনি এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছেন।
    তাঁর প্রতিটি লেখায় সেই স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়। এছাড়া অদ্যাবধি তাঁর সাহিত্য রচনার
    বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবগত হলাম। তাঁর
    লেখা "রক্তের ভেতর হেঁটে যাই " কাব্যগ্ৰন্থটি
    আমি পাঠ করেছি। প্রতিটি কবিতাই হৃদয়
    স্পর্শী। এছাড়া কবি জীবনানন্দ দাশের উপর
    আজকের লেখাটিও যথার্থ এবং সুন্দর। লেখাটির শিরোনামে কিছু টাইপিং মিসটেক
    আছে ।প্রসঙ্গ " জীবনানন্দের দাশের কবিতা"
    না হয়ে " জীবনানন্দ দাশের কবিতা" হবে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কবি শোভা চন্দ

কবি-প্রাবন্ধিক তাজিমুর রহমান

কবি বৃন্দাবন দাস