কবি- অনুবাদক তূয়া নূর


তূয়া নূর

জন্ম:- যশোর শহরের পুরাতন কসবায়। বাবা এ কে নূর মোহাম্মদ। মা জামিলা নূর। পড়াশুনা ও বেড়ে ওঠা যশোর শহরে। উচ্চ শিক্ষা নেয়ার জন্য আসি ঢাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে পড়াশুনা শেষ করে পাড়ি দিই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে উচ্চ শিক্ষার জন্য। লেখালেখি ছোটবেলা থেকেই। 


কবি নেওমি শিহাব নাই-এর কবিতার

অনুবাদে কবি-অনুবাদক তূয়া নূর



কবি নেওমি শিহাব নাই


সমসাময়িক আমেরিকান সাহিত্যে যারা অগ্রদূত তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন নেওমি শিহাব নাই। জন্মগ্রহণ করেন মিসৌরীর সেন্ট লুইসে ১৯৫২ সালে। তাঁর বাবা একজন প্যালেস্তিনি শরণার্থী এবং তাঁর মা ছিলেন জার্মান এবং সুইস বংশোদ্ভূত আমেরিকান। বাবা মারা যান তেরো বছর আগে। মা তাঁর সাথে থাকেন। মায়ের বয়স এখন ৯৩ বছর। কবি নেওমীর কৈশোরকাল কেটেছে জেরুজালেম এবং টেক্সাসের সান আন্টোনিওতে। ওয়েস্ট ব্যাংকের সিনজিল গ্রামে তার দাদীর বাড়ি। তাঁর সঙ্গ নেওমির জীবনে দাগ কাটে।  তিনি সান আন্তোনিওয়ের ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ডিগ্রী অর্জন করেন।  নেওমি তাঁর কাজের জন্য অসংখ্য সম্মান ও পুরষ্কার পেয়েছেন। 

তাঁর সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ Cast Away। এ ছাড়া তাঁর রয়েছে অনেক গুলো কাব্য কাব্য সংকলন। এদের মধ্যে A Maze Me, Fuel, Red Suitcase, Different way to pray, One the edge of sky, Invisible, Tender Spot উল্লেখযোগ্য। তিনি লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস ও রচনা। তিনি সম্পাদনা করেছেন অনেক গুলো কবিতার এন্থোলজি। শিশুকিশোর জন্য লিখেছেনও তিনি। শিশুতোষ লেখার মধ্যে Habibi, The turtle of Oman উল্লেখযোগ্য। 

তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানজনক ফেলোশিপ। একাডেমী অফ আমেরিকান পোয়েটস এর আচার্য ছিলেন ২০১০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত। 


হাতের মুঠি


(আমরা ভুলে যায় আমরা সবাই মৃত মানুষ কথা বলি মৃত মানুষের সাথে। —জর্জ লুইস বর্গেস)


টেম্পিকোর দক্ষিণের রাস্তায় এই প্রথম,

অনুভব করলাম আমার জীবনটা যেন বের হয়ে যাচ্ছে,

মরুভূমিতে ড্রামের শব্দ খুব জোরে কানে এসে বাজছে। 

আমার বয়স তখন সাত, গাড়িতে শুয়ে দেখছি

পাম গাছ গুলো ঘূর্ণাবর্তে অসুস্থ এক ঢঙে জানলার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। 

আর আমার পাকস্থলী তরমুজের মতো ফেটে চৌচির হচ্ছে ত্বকের ভেতর। 


আমাদের যাত্রাটা ছিলো টানা কয়েকদিনের। 

খুব কাতর হয়ে জিগ্যেস করলাম মাকে,

কী ভাবে বুঝতে পারে একজন যখন সে মারা যায়?

আনকা এক আত্মবিশ্বাস নিয়ে মা বললো,

যখন তুমি আর হাতের মুষ্টি বন্ধ করতে পারো না। 


কিছু বছর পর এই যাত্রাপথের কথা চিন্তা করে মনে মনে হাসি,

সীমান্তটা পার হতে হবে একা একা

সীলমোহর করে নিস্পত্তিহীন দুর্দশা। 

এইতো সেই আমি মরি নি তো, বেঁচে আছি এখনো,

এখনো শুয়ে আছি পিছনের সীটে সব প্রশ্ন পিছে ফেলে,

বন্ধ করছি ও খুলছি আমার ছোট্ট হাতের মুঠি। 


এতো সুখ


এতো সুখ দিয়ে কী করবে তুমি ভেবে খুব মসিবতে পড়ে যাও। 

দুঃখবোধে তুমি কপাল থাবড়াতে পারো,

একটা ক্ষত লোশন ও কাপড় বেঁধে সারিয়ে তুলতে পারো। 

যখন তোমার চারপাশে জগত ভেঙে পড়ে তখন কিছু টুকরা তুমি কুড়িয়ে নিতে পারো,

কিছু একটা হাতে ধরে রাখতে পারো যেমন টিকিটের ছেড়া অংশ, খুচরো পয়সা। 


সুখ ভেসে বেড়ায়। 

তুমি তাকে পারবে না ধরে রাখতে। 

তার কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। 

সুখ নেমে আসে প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদে গান গেতে গেতে

আবার শূন্যে মিলায় যখন তার ইচ্ছে হয়। 

যেভাবেই হোক তুমি তো হও সুখী। 

এটা সত্য, এমন কি যখন তুমি একসময় বাস করতে শান্তি পূর্ণ গাছবাড়িতে 

আর এখন বাস করো কোলাহল পূর্ণ ধূলিকণার উপর যা তোমাকে একটুও অসুখী করে না। 

সবকিছুর একটা জীবনব আছে তার নিজের মতো, 

যা জেগে উঠতে পারে কফি কেক, পাকা পীচের অপার সম্ভাবনায়,

আর ভালবাসো —এমন কি মেঝেকে, যেখানে ধোয়া-মোছা প্রয়োজন, 

ময়লা লিনেন কাপড় ও ভাঙা দাগ পড়া গানের রেকর্ডকে….

যেহেতু এতো সুখ রাখার মতো বড় কোন জায়গা নেই,

তুমি কাঁধ ঝাঁকাও, হাত বাড়াও, ছুঁয়ে দাও

এবং তাকে প্রবাহিত হতে দাও তামাম জিনিষের ভেতর। 

আত্মতুষ্টিতে ভুগো না। 

কোন সুনাম কেনার চেষ্টা করো না যেমন করে না রাতের আকাশ চাঁদের জন্য,

এটা ধরে রাখো অনন্ত, বণ্টন করো,

আর এই ভাবে পরিচিত পাবে। 


রক্ত


বাবা বলতেন, একজন সত্যিকার আরব জানে

কিভাবে হাতের তালুতে আটকাতে হয় মাছি। 

তিনি ভন ভন করা মাছি মুহূর্তে তালু-বন্দী করে তাঁর কথার সারবত্তা প্রমাণ করে দিতেন;

অতিথি-জন মাছি মারার জালি হাতে নিয়ে তাঁর দিকে 

তখন নির্বাক চেয়ে থাকতো। 


বসন্তে আমাদের পাম গাছ গুলো সাপের মতো খোসা ছাড়ে।

সত্যিকারের আরবদের বিশ্বাস তরমুজ নিরাময় করতে পারে পঞ্চাশটি উপায়ে

এ সব কিছু পাল্টে আমি নিজের মতো মাপে ছাঁচে ফেলে যুতসই করে নিয়েছিলাম। 


একটা মেয়ে কড়া নাড়ে দরজায় বছর খানেক আগে,

একজন ‘আরব’ দেখার খুব ইচ্ছে তার। 

আমি বললাম, আমাদের এখানে এমন একজনও নেই। 

এরপর বাবা আমাকে ডেকে বললেন, কে ছিলো সে?

‘শিহাব’ মানে উল্কা— ছুটে আসা তারা—

ভীষণ সুন্দর একটা নাম, আকাশের কাছ থেকে ধার করে নেয়া। 


একবার বলেছিলাম, মারা গেলে এ সব কিছু কি ফিরিয়ে দিতে হবে?

তিনি বললেন, এটাইতো একজন আরবের মতো কথা!


আজকের কাগজের প্রথম পাতায় একটা শিরোনাম আমার রক্ত জমাট বেঁধে দিলো 

ছোট্ট প্যালেষ্টাইনী শিশু ঝুলছে ট্রাকে

বাস্তুহারা আরবিয় ডুমুর, এ এক নৃশংসতা ও ভয়াবহতার ইতিহাস যা খুব ভারী আমাদের জন্য। 

কোন পতাকা আমরা দোলাবো বাতাসে বলো?

টেবিলের ম্যাটের উপর নীল সেলাই

আমি ওড়ায় পাথর ও বীজের পতাকা। 


আমি বাবাকে ফোন করে সংবাদটা নিয়ে কথা বলি

সহ্য করা তার পক্ষে খুব কঠিন

যা অসম্ভব তাঁর জানা দুটো ভাষার কোনটা দিয়ে প্রকাশ করা। 


আমি গাড়ি চালিয়ে গ্রামে ঢুকি, খুঁজি ভেড়া, গরু,

সনির্বন্ধ মিনতি করি ইথারে:

কে কাকে সভ্য বলে?

কাতর হৃদয় দাঁড়াবে কোথায়?

একজন সত্যিকার আরব যে —কি করণীয় এখন তার?





















Comments

Popular posts from this blog

কবি শোভা চন্দ

কবি-প্রাবন্ধিক তাজিমুর রহমান

কবি বৃন্দাবন দাস